মাঝি ও পারগানা সিস্টেম | SANTALI CUSTOMARY LAW
মাঝি ও পারগানা সিস্টেম হল সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর প্রাচীন সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যা আজও ভারতে এবং বাংলাদেশের রাজ্য জুড়ে প্রচলিত। এটি মূলত সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী শাসন ও বিচারব্যবস্থা, যা সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষা, শান্তি বজায় রাখা এবং সমাজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য গঠিত হয়েছে।
১. মাঝি:
মাঝি হলেন গ্রামের প্রধান ব্যক্তি। তিনি গ্রামবাসীর দ্বারা নির্বাচিত হন এবং গ্রামের সমস্ত সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং আইনগত বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মাঝি প্রধানত নিম্নলিখিত কাজগুলো করেন:
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা: গ্রামের ভেতর কোনো ঝগড়া-বিবাদ হলে, মাঝি সেটির মীমাংসা করে থাকেন। এটি সাধারণত ঐতিহ্যবাহী নিয়ম-কানুন অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব: সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব-অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন মাঝি। বিশেষ করে সাঁওতালদের প্রধান উৎসবল সহরায় এবং মাঃ মড়ে বাহা মাঘ সিম এড়ঃ সিম মাঝির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
আর্থ-সামাজিক সিদ্ধান্ত: গ্রামের কোনো সদস্য বা পরিবার সমস্যায় পড়লে মাঝি তাদের জন্য গ্রামবাসীর কাছ থেকে সাহায্য সংগ্রহ করতে পারেন।
২. পারগানা:
পারগানা হলো একাধিক গ্রামের সম্মিলিত একটি বৃহত্তর ইউনিট, যা বেশ কয়েকটি গ্রামের মাঝিদের নিয়ে গঠিত হয়। একজন পারগানা প্রধান (কখনো পারগানা রাজা বলা হয়) পারগানার সব গ্রামের মাঝিদের নেতৃত্ব দেন।
গ্রামের মধ্যে দ্বন্দ্ব মীমাংসা: যদি কোনো গ্রামের অভ্যন্তরীণ সমস্যা মাঝি দ্বারা সমাধান না হয়, তা হলে সেটি পারগানায় উপস্থাপন করা হয়। পারগানা প্রধান তখন মাঝিদের সঙ্গে মিলে সিদ্ধান্ত নেন।
পারগানার মধ্যে ঐক্য ও শান্তি বজায় রাখা: পারগানা প্রধান গ্রামগুলোকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন এবং বিভিন্ন গ্রামের মাঝে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেন।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন: বিভিন্ন গ্রামের আর্থিক ও সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য পারগানা প্রধান এগিয়ে আসেন। পারগানার মধ্য দিয়ে আদিবাসীদের ঐক্যবদ্ধ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়।
৩. দরবার (আতু দুরুব/কুলহি দুপরুপ):
দরবার/আতু দুরুব/কুলহি দুপরুপ - হল মাঝি ও পারগানা প্রধানের সমন্বয়ে গঠিত একটি শীর্ষস্থানীয় পরিষদ বা সভা। এই সভায় সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আদিবাসী আইন ও বিচার: দরবার/আতু দুরুব/কুলহি দুপরুপ সমাজের বড় বড় সমস্যা, বিশেষ করে জমিজমা সংক্রান্ত, সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ, এবং সামাজিক অন্যায়-অবিচার নিয়ে আলোচনা হয়। দরবার/আতু দুরুব/কুলহি দুপরুপ- সাধারণত সাঁওতাল ঐতিহ্যের ভিত্তিতে বিচার করে।
প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিচালনা: দরবার/আতু দুরুব/কুলহি দুপরুব সাঁওতাল সমাজের প্রশাসনিক ব্যবস্থার চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে। সমাজের বিভিন্ন নেতৃত্ব ও সদস্যদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
৪. অন্যান্য ভূমিকা:
পারাণিক: মাঝির পাশাপাশি গ্রামে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো পারাণিক, যিনি মূলত মাঝির সহযোগী এবং পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন। সমাজের যেকোনো সমস্যায় তিনি মাঝিকে সহায়তা করেন।
জগ মাঝি: গ্রাম সমাজের নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন জোগ মাঝি। তিনি বিভিন্ন আইন লঙ্ঘনের ব্যাপারে মাঝিকে জানান এবং গ্রামে শান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করেন।
ঐতিহ্যগত ও আধুনিক পরিবর্তন:
মাঝি ও পারগানা সিস্টেম হল একটি প্রাচীন প্রথা হলেও, এটি এখনও সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে বড় ভূমিকা পালন করছে। যদিও আধুনিক ভারতীয় প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থা চালু হয়েছে, তবে সাঁওতাল সমাজে এই ব্যবস্থার প্রচলন এখনও ব্যাপক। আধুনিক যুগে এটি বিভিন্ন আইন এবং পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নতুনভাবে অভিযোজিত হয়েছে।
এই প্রথার মাধ্যমে সাঁওতালরা নিজেদের ঐতিহ্য, ভাষা, এবং সংস্কৃতি রক্ষা করে চলেছে, এবং তাদের সামাজিক কাঠামোতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
৫. আধুনিক যুগে পরিবর্তন:
আধুনিক সময়ে, মাঝি ও পারগানা সিস্টেম কিছু পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছে, তবে এটি এখনও সাঁওতাল সমাজে গভীর প্রভাব রাখে। অনেক আধুনিক আইন এবং নীতির সাথে এ প্রথার সমন্বয় করা হয়েছে। তবে সাঁওতালদের অধিকাংশ মানুষ এখনও ঐতিহ্যবাহী নিয়ম-কানুন মেনে চলে এবং নিজেদের সামাজিক পরিচয় বজায় রাখার জন্য এই ব্যবস্থা অনুসরণ করে।
সরকারি প্রশাসনের সাথে মেলবন্ধন: যদিও সাঁওতাল সমাজের মধ্যে এই প্রথার গুরুত্ব অপরিসীম, তবে আধুনিক সরকারি প্রশাসনও তাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। মাঝি ও পারগানা সিস্টেম কখনও কখনও স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনের সাথে সহযোগিতায় কাজ করে, বিশেষত জমি অধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে।
মাঝি ও পারগানা সিস্টেম হলো সাঁওতাল সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি, যা তাদের ঐতিহ্য, সমাজ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সংরক্ষণ করে রেখেছে।
0 Comments