“সারপা” কুড়ি দাসাই নৃত্য: সাঁওতাল সংস্কৃতির অপব্যাখ্যা
সাঁওতাল সমাজে দাসাই নৃত্যের ঐতিহ্যটি খুবই গুরুত্ব বহন করে, যা সাধারণত সাঁওতাল পুরুষদের মাধ্যমে সংঘটিত হয় এবং সাঁওতাল সংস্কৃতির মধ্যে একটি ঐতিহ্যবাহী অবস্থান তৈরি করেছে। তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি নতুন প্রথার আবির্ভাব হয়েছে, যেখানে মহিলাদের অংশগ্রহণে "কুড়ি দাসাই" বা "সাড়পা এনেজ" নামে পরিচিত একটি নৃত্যের প্রচলন ঘটেছে। এ ধরনের নাচের মাধ্যমে সাঁওতাল সমাজের একটি বিভ্রান্তিমূলক এবং অবমূল্যায়নমূলক চিত্র সমাজে তুলে ধরা হচ্ছে, যা সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী দাসাই সংস্কৃতিকে বিপদে ফেলছে।
ঘটনার বর্ণনা ও প্রেক্ষাপট
সাঁওতাল সমাজের দাসাই নাচ সাধারণত পূজার সময়ে সাঁওতাল পুরুষদের দ্বারা প্রচলিত হয়, যা তাদের ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু বর্তমানে কিছু মহিলা সাঁওতাল পুরুষদের পোশাক পরে, এক নতুন ধাঁচের নৃত্য প্রদর্শন করে অর্থ সংগ্রহ করছেন, যা সাঁওতাল সমাজের মূল সংস্কৃতি থেকে ভিন্নতর। এর ফলে সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী মাঝি ও পারগানা সিস্টেমের মূল্যবোধ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। মূলত বাসস্টপ, হাইওয়ে, কালীমণ্ডপ, দুর্গাপূজা মণ্ডপে এ ধরনের নাচের প্রদর্শনী সমাজে বিভ্রান্তির সঞ্চার করছে, যা সাঁওতাল সমাজের সামাজিক কাঠামো ও ঐতিহ্যকে আঘাত করছে।
সম্ভাব্য কারণসমূহ
- সাঁওতাল মহিলাদের একটি অংশের ধারণা যে, যেমনভাবে সাঁওতাল পুরুষরা দুর্গাপূজার সময় দাসাই নৃত্য করে, তেমনি নারীরাও কালিপূজার সময় নতুন সাজে নৃত্য করতে পারেন। তবে, "সাড়পা" বা "কুড়ি দাসাই" কোনোভাবেই সাঁওতালদের আসল সংস্কৃতি নয়।
- কিছু মহিলা এই ধরণের নাচের মাধ্যমে আদিবাসী সাঁওতাল সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির প্রচলন করছেন, যা মাঝি ও পারগানা সিস্টেমকে একটি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এ ধরনের নৃত্যের ফলে সাধারণ মানুষের মাঝে সাঁওতাল সমাজের মাঝি এবং পারগানা সিস্টেম সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে।
- এমন প্রেক্ষাপটে মাঝি এবং পারগানা নেতৃবৃন্দের ওপর প্রশ্ন উঠছে, কেন তাঁরা এ বিষয়ে নিরব রয়েছেন। এতে মনে করা হচ্ছে যে, তাঁরা এ অপসংস্কৃতিকে মেনে নিয়েছেন কি না।
অতীতের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা
- একটি ফেসবুক পোস্টে এক আদিবাসী মহিলা উল্লেখ করেন যে, একবার কলকাতায় তারা একটি বিশেষ নৃত্য অনুষ্ঠানে অংশ নেন, এবং এরপর ফেরার পথে এক "দিকু" বা ভিন্নজাতির ব্যক্তি তাদেরকে টাকা দিয়ে নাচ দেখানোর প্রস্তাব দেন। এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে আদিবাসী সাঁওতালদের প্রতি ভুল ধারণা তৈরি করছে যে, সাঁওতালরা অর্থের বিনিময়ে যেকোনো সময় নাচ দেখাতে প্রস্তুত।
- আরেকটি ঘটনা চিহ্নিত করা যায় ছত্তিশগড়ে, যেখানে ২০১৮-১৯ সালে একটি আদিবাসী নৃত্য দলের ওপর গাড়ি উঠিয়ে দেওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল। এরকম দুর্ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে ঘটলে এর জন্য কে দায়ী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। সমাজের নেতৃবৃন্দের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন যে, এ ধরনের ঘটনা থেকে আদিবাসী সমাজের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।
- সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষা: সমাজে অপসংস্কৃতির নামে যা প্রচার হচ্ছে, তা সাঁওতাল ঐতিহ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। পোস্টটি শেয়ার করলে আদিবাসী সাঁওতাল জনগণ এ বিষয়ে সচেতন হতে পারবে এবং তাদের নিজেদের ঐতিহ্য রক্ষায় সচেষ্ট হবে।
- প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ: সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন, যা "কুড়ি দাসাই" বা "সাড়পা এনেজ" ধরনের অপসংস্কৃতিকে দূর করতে পারে। আদিবাসী সমাজে এই বিষয়টি নিয়ে সঠিক তথ্য ছড়ানো হলে সাঁওতাল সংস্কৃতির প্রকৃত রূপ ও মর্যাদা বজায় থাকবে।
- নেতৃত্বের ভূমিকা: মাঝি, পারগানা, এবং অন্যান্য নেতাদের এ বিষয়ে সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজন। পোস্টটি শেয়ারের মাধ্যমে এ বিষয়ে নেতৃত্বদের দায়িত্ব এবং তাদের প্রতিক্রিয়া প্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে।
পোস্টটি শেয়ার করার মাধ্যমে আদিবাসী সাঁওতাল সমাজকে একত্রিত করা, সচেতনতা বাড়ানো এবং অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এ প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য। এইভাবে সাঁওতাল ঐতিহ্যের মর্যাদা রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আদিবাসী সংস্কৃতিকে বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

0 Comments